• ঢাকা

  •  মঙ্গলবার, জুন ১৮, ২০২৪

ভিনদেশ

ভারতে পেঁয়াজের কেজি ২ টাকা, ক্ষেতেই পুড়িয়ে দিচ্ছেন কৃষক

নিউজ ডেস্ক:

 প্রকাশিত: ০৮:৩৮, ১২ মার্চ ২০২৩

ভারতে পেঁয়াজের কেজি ২ টাকা, ক্ষেতেই পুড়িয়ে দিচ্ছেন কৃষক

ভারতের মহারাষ্ট্রে পেঁয়াজের এবার অতিরিক্ত ফলন হয়েছে। ফলে বিপাকে পড়েছেন পেঁয়াজচাষীরা। বাড়তি ফলনের কারণে এবার পেঁয়াজের দাম এতোটাই কমে গেছে যে, প্রতি কেজি মাত্র দু-তিন টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা। এ অবস্থায় অনেক কৃষক ক্ষোভে ক্ষেতেই তাদের ফসল নষ্ট করে দিচ্ছেন। 

মহারাষ্ট্রের নাসিক জেলার কৃষক কৃষ্ণ ডোংরে এবার সপরিবারে তার পেঁয়াজ চাষের জমিতে হোলিকা দহন ‘অনুষ্ঠান’ করেছিলেন। তার সেই ‘অনুষ্ঠান’-এর ছবিসহ খবর বেশ কিছু জাতীয় সংবাদপত্রে ছাপানো হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে ভাইরালও হয়েছিল সেই ‘দহন’এর ছবি।

হোলি উৎসবের আগের দিন গত ৬ মার্চ উদযাপন করা হয় ‘হোলিকা দহন’। বাংলায় যাকে ন্যাড়াপোড়া বলেন অনেকে। আর ইংরেজিতে বনফায়ার।

বিবিসি জানায়, একজন কৃষকের পারিবারিক ‘অনুষ্ঠান’ জাতীয় স্তরের সংবাদপত্রে এ কারণে উঠে আসার কারণ হচ্ছে, তিনি আসলে খড়কুটার বদলে ‘হোলিকা দহন’ করেছেন নিজের ক্ষেতের প্রায় ১৫ হাজার কেজি পেঁয়াজ পুড়িয়ে দিয়ে।

ডেংরে বলেন, “পনেরো দিন আগে আমি নিজের রক্ত দিয়ে লেখা একটা আমন্ত্রণপত্র পাঠিয়েছিলাম মুখ্যমন্ত্রীকে। তিনি যেন এসে আমদের সঙ্গে যোগ দেন ওই দিন।”

ওটা তো আসলে অনুষ্ঠান ছিল না, সেটা ছিল কয়েক মাসের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের পরে ফসল নিজের হাতেই নষ্ট করতে বাধ্য হওয়ার ব্যথা। ব্যাংক থেকে ধার নেওয়া টাকায় চাষ করেও উপযুক্ত দামে বিক্রি করতে পারছেন না ডোংরে। সুদসহ ব্যাংকের দেনা কীভাবে শোধ দেওয়া যাবে সে চিন্তায় দিন কাটছে তার।

ডোংরে বিবিসি বাংলাকে বলেন, “পেঁয়াজের দামের যা অবস্থা তাতে হয়তো বা আত্মহত্যাই করতে হতো। সেটা করতে পারলাম না, তাই হাতে ফলানো ফসলটাই শেষ করে দিলাম।“

শুধু ডোংরে নয়, তার মতো অবস্থা মহারাষ্ট্রের আরো হাজার হাজার পেঁয়াজচাষী পরিবারেও।

পেঁয়াজচাষী নামদেব ঠাকরে বলেন, “ছোট ছেলেটা ১০ টাকা দামের একটা আইসক্রিম খেতে চাইছিল, দিতে পারিনি। ১০ টাকার আইসক্রিম মানে তো পাঁচ কিলো পেঁয়াজের দাম!”

এ বছর মহারাষ্ট্রে পেঁয়াজের ফলন এত বেশি হয়েছে, যে কৃষকরা প্রতি কেজি মাত্র দুই বা তিন টাকা দর পাচ্ছিলেন দু'দিন আগে পর্যন্তও। চাষের খরচ তো তাতে উঠছেই না, উল্টে আড়তে পৌঁছে দিতে গেলে তাদের লোকসানের বোঝা আরো বাড়বে। তাই ক্ষেতের পেঁয়াজ নষ্ট করে ফেলছেন কৃষকরা।

ডোংরে যেমন পুড়িয়ে ফেলেছেন ক্ষেতের পেঁয়াজ, তেমনই ট্র্যাক্টর চালিয়ে ফসল নিজেই নষ্ট করে দিয়েছেন নাসিকের নাইপালা গ্রামের কৃষক রাজেন্দ্র বোঢ়গুঢ়ে।

বোঢ়গুঢ়ে জানান, “তিন একর জমিতে পেঁয়াজ চাষ করেছিলাম এই মওসুমে। পেঁয়াজ মণ্ডিতে আড়ৎদারের কাছে পৌঁছিয়ে দেওয়া পর্যন্ত এক লাখ দশ হাজার টাকা মতো খরচ হয় প্রতি একরের ফসলে। এক একরে ১৫০ কুইন্টাল তো হয়, ভাল ফলন হলে ১৭০-৮০ কুইন্টালও হয়। সেই হিসাব যদি করেন, তাহলে এক একরের ফসল থেকে গড়ে আমি দাম পাচ্ছি ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা, আমার খরচের অর্ধেক। তো সেই ফসল আড়তে পৌঁছিয়ে দেওয়ার জন্য আরো বাড়তি খরচ করে লোকসানের বোঝা বাড়াবো নাকি আমি?"

ভারতের মহারাষ্ট্রই এক সময় ছিল পেঁয়াজ চাষের মূলকেন্দ্র। কিন্তু বেশ কয়েক বছর যাবত মধ্যপ্রদেশ আর গুজরাতেও পেঁয়াজ চাষ শুরু হয়েছে। তার ফলে মার খাচ্ছেন মহারাষ্ট্রের পেঁয়াজচাষীরা। 

মহারাষ্ট্রের নাসিকই সবচেয়ে বড় পেঁয়াজ বিপণন কেন্দ্রের আড়ৎদার হীরামন পরদেশি বলেন, “আগে শুধু মহারাষ্ট্র আর অন্ধ্র প্রদেশেই পেঁয়াজের মূল চাষটা হতো। কিন্তু এখন মধ্যপ্রদেশ আর গুজরাতের চাষীরাও ভাল পেঁয়াজ চাষ করছেন। গুজরাতে তো পেঁয়াজচাষীদের জন্য সেখানকার সরকার অনুদানও দিয়েছে এবার। আর আমাদের পেঁয়াজের যে বাজার ছিল, সেটা গুজরাত, মধ্যপ্রদেশ ধরে নিয়েছে অনেকটা। তাই এখানকার চাষীরা মার খাচ্ছে।“

তিনি বলেন, কয়েকদিন আগে পর্যন্তও চাষীরা কুইন্টাল প্রতি (এক কুইন্টাল ১০০ কেজির সমান) তিনশো বা চারশো টাকা দাম পেয়েছে। হোলির পরে বৃহস্পতিবার থেকে আবার বাজার খোলার পরে দাম সামান্য কিছুটা বেড়ে হয়েছে কুইন্টাল প্রতি প্রায় সাতশো টাকা। কিন্তু তাতেও চাষীদের ক্ষতির হাত থেকে বাঁচানো যাবে না।

হিরামন বলেন, দুবাই হয়ে পাকিস্তানে যেতো আমাদের পেঁয়াজ। শ্রীলঙ্কাতেও রপ্তানি হতো। কিন্তু ওই দুটো দেশের যা অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, সেখানে আর পেঁয়াজ পাঠানোর ঝুঁকি নিতে চাইছেন না ব্যবসায়ীরা। আবার বাংলাদেশেও ভারতীয় পেঁয়াজের রপ্তানি কমে গেছে।

মার্চ ১২, ২০২৩

এসবিডি/এবি/

মন্তব্য করুন: