• ঢাকা

  •  রোববার, জানুয়ারি ২৯, ২০২৩

সাহিত্য-সংস্কৃতি

আড়াই হাজার বছর আগের পাণিনি সূত্রের সমাধান করলেন কেমব্রিজের ছাত্র

অনলাইন ডেস্ক:

 প্রকাশিত: ১০:৪৩, ১৮ ডিসেম্বর ২০২২

আড়াই হাজার বছর আগের পাণিনি সূত্রের সমাধান করলেন কেমব্রিজের ছাত্র

‘দু’টি সমশক্তির নিয়মের মধ্যে দ্বন্দ্ব হলে ব্যাকরণের ক্রমানুসারে যে নিয়মটি পরে আসে তা-ই জয়ী হবে’, প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের এই প্রখ্যাত সংস্কৃত ব্যাকরণ রচয়িতা পাণিনি সূত্রের সমাধান করেছেন কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ঋষি রাজপোপট।

খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দী থেকে এই সংস্কৃত ব্যাকরণগত সমস্যা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছিল। 

বিবিসি'র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৭ বছর বয়সী ঋষি অতুল রাজপোপট নামে কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই ভারতীয় ছাত্র প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের ওই সমস্যার সমাধান করতে পেরেছেন। প্রাচীন সংস্কৃত পণ্ডিত পাণিনির লেখা একটি ভাষ্য তিনি ডিকোড করেছেন বলে জানা গেছে। ঋষি অতুল রাজপোপট, কেম্ব্রিজের সেন্ট জনস কলেজের ‘এশিয়ান অ্যান্ড মিডল ইস্টার্ন স্টাডিজ’-বিভাগের একজন গবেষক।

তিনি প্রখ্যাত সংস্কৃত ব্যাকরণ রচয়িতা। পাণিনির জন্মকাল সম্পর্কে মতভেদ আছে। এই সকল মতভেদ অনুসারে ধরা যায়, খ্রিষ্টপূর্ব ৮০০-৪০০ অব্দের মধ্যে পাণিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। গান্ধার রাজ্যের শালাতুর (বর্তমান লাহোরের নিকটবর্তী একটি স্থান) নামক পল্লীকে তাঁর জন্মস্থান হিসাবে বিবেচনা করা হয়। জন্মস্থানের নামে তাঁকে অনেক সময় 'শালতুরীয়' নামে অভিহিত করা হয়েছে।

পাণিনি নির্ধারিত একটি সূত্রে বলা হয়েছে, দু’টি সমশক্তির নিয়মের মধ্যে দ্বন্দ্ব হলে ব্যাকরণের ক্রমানুসারে যে নিয়মটি পরে আসে তা-ই জয়ী হবে। কিন্তু এই নিয়ম মানলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে ফলাফল ভুল হয়।

পাণিনি সূত্রের প্রথাগত ব্যাখ্যার বিরোধিতা করে ঋষি রাজপোপট যুক্তি দিয়ে বলেন, পাণিনির আসলে তুলনা করতে চেয়েছিলেন শব্দের বাম এবং ডান দিকে প্রযোজ্য নিয়মগুলোর মধ্যে। তিনি বলতে চেয়েছিলেন ডানদিকের নিয়মটি বেছে নেওয়ার কথা। 

রাজপোপটের দাবি, পাণিনির ‘ভাষা যন্ত্র’ প্রায় কোনো ব্যতিক্রম ছাড়াই ব্যাকরণগতভাবে নির্ভুল শব্দ তৈরি করেছিল।

এই সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যে খুব সহজ ছিলো না ঋষির কাছে, তা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এই আবিষ্কার আমার কাছে একটা দারুন উত্তেজনার মুহূর্ত ছিল। প্রায় ন’মাস ধরে এই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছি। এক সময় হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম। তারপর এক মাস বই খাতা বন্ধ করে শুধু সাঁতার কেটেছি, সাইকেল চালিয়েছি, রান্না করেছি আর প্রার্থনা, ধ্যান করেছি। কী আশ্চর্য তারপর কাজে ফিরতেই সব কিছু সহজ বলে মনে হতে শুরু করলো।’ 

তবে সম্পূর্ণ সমস্যা সমাধানে ঋষির আরো দু’বছর সময় লেগেছে।

ঋষির এই সমাধানের খবরে উচ্ছ্বসিত অধ্যাপক ভার্জিয়ানি বলেন, ‘আমার ছাত্র ঋষি এই সমস্যার সমাধান করে ফেলেছেন। ঋষি এমন একটি সমস্যার সমাধান খুঁজে পেয়েছেন যা বহু শতাব্দী ধরে পণ্ডিতদের বিভ্রান্ত করে রেখেছে৷ এই আবিষ্কারটি এমন সময়ে সংস্কৃতের অধ্যয়নে বিপ্লব ঘটাবে যখন ভাষার প্রতি আগ্রহ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।’

পাণিনি:

তিনি প্রখ্যাত সংস্কৃত ব্যাকরণ রচয়িতা। পাণিনির জন্মকাল সম্পর্কে মতভেদ আছে। এই সকল মতভেদ অনুসারে ধরা যায়, খ্রিষ্টপূর্ব ৮০০-৪০০ অব্দের মধ্যে পাণিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। 

গান্ধার রাজ্যের শালাতুর (বর্তমান লাহোরের নিকটবর্তী একটি স্থান) নামক পল্লীকে তাঁর জন্মস্থান হিসাবে বিবেচনা করা হয়। জন্মস্থানের নামে তাঁকে অনেক সময় 'শালতুরীয়' নামে অভিহিত করা হয়েছে।

পণি বা পাণিন্‌ একটি গোত্র নাম। সংস্কৃত সাহিত্যে পণি নামে একটি গোষ্ঠীর নাম পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, ফিনিসিয় জাতিগোষ্ঠীর লোকেরা একসময় ভারত মহাসাগরের উপকূলে বসতি স্থাপন করেছিল। এদেরকে পণি, ফিনিকিয়, পিউনিক ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হতো। পাণিনির বাবা ছিলেন ফিনিকিয় বা পণি গোষ্ঠীর মানুষ। তাঁর বাবার নাম ছিল শলঙ্ক। এই কারণে অনেক সময় তাঁকে শলাঙ্কি বলা হয়। 

পাণিনির মা ইলেন দক্ষ জাতির কন্যা। অনেকের মতে, পাণিনির মায়ের নাম ছিল দাক্ষী। এই সূত্রে অনেকে ক্ষেত্রে তাঁকে দাক্ষীপুত্র বা দাক্ষেয় নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে।

পাণিনি পারিবারিক সূত্রে বেদোত্তর সনাতন পৌরাণিক ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন। মূলত তিনি ছিলেন অহিগলমালার (শিব) উপাসক। সেইজন্য তাঁকে আহিক বলা হয়েছে।

তাঁর শিক্ষকের নাম ছিল উপবৎস। তাঁর রচিত ব্যাকরণের নাম - অষ্টাধ্যায়ী। কথিত আছে, মহাদেবের ঢাকের শব্দে চৌদ্দটি ধ্বনি উৎপন্ন হয়। এই ধ্বনি অনুসারে তিনি শব্দসূত্র তৈরি করেন। একে বলা হয়েছে শিবসূত্রজাল অথবা মাহেশ্বর সূত্র। মূলত এই সূত্রগুলো পাণিনির ব্যাকরণের চাবিকাঠি। শিবসূত্রের প্রত্যেকটির নাম সংজ্ঞা বা সংজ্ঞাসূত্র। এই ১৪টি শিবসূত্র হলো -

১) অ ই উ ণ্
২) ঋ ৯ ক্
৩) এ ও ঙ্
৪) ঐ ঔ চ্
৫) হ য ৱ র ট্
৬) ল ণ্
৭) ঞ্ ম ঙ্ ণ ন ম্    ৮. ঝ ভ ঞ
৯) ঘ ঢ ধ ষ্
১০) জ ব গ ড দ শ্
১১) খ র্ফ ছ ঠ থ চ ট ত ৱ্
১২) ক প য্
১৩) শ ষ স র্
১৪) হ ল্ ।

মনে রাখার সুবিধার জন্য পাণিনি এই সূত্রগুলোকে আরো সংক্ষিপ্ত করে নাম দিয়েছিলেন প্রত্যাহার (সংক্ষেপিত) সূত্র। এক্ষেত্রে প্রতিটি সূত্রের প্রথম ও শেষ বর্ণ যুক্ত করে সংক্ষিপ্ত বা প্রত্যাহার সূত্র হয়েছিল। পাণিনি ব্যাকরণে প্রত্যাহার সূত্র মোট ৪৩টি। তাঁর সমগ্র রচনাটি আটটি অধ্যায়ে বিভাজিত এই সূত্রে এই গ্রন্থের নামকরণ করা হয়েছে- অষ্টাধ্যয়ী। এই ব্যাকরণের অন্যতম ভাষ্যকার ছিলেন পতঞ্জলি।

পাণিনি তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন। পঞ্চতন্ত্র মতে, তিনি সিংহের আক্রমণে মৃত্যুবরণ করেছিলেন।

ডিসেম্বর ১৮, ২০২২

এসবিডি/এবি/

মন্তব্য করুন: